হৃদয় ছোঁয়া গল্প।

 

বার বিয়ে
বাড়িতে উৎসব মুখোর পরিবেশ চারিদিকে লাল, নীল বাতি জ্বলছে। আজ আমার বাবার বিয়ে, হ্যা আমার বাবার দ্বিতীয় বিয়ে।

আমরা চার বোন থাকা শর্তেও ষাট বছর বয়সে বংশ রক্ষার করার জন্য বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছে।
ছেলে সন্তান হলো বংশের প্রদীপ । মেয়ে সন্তান কখন বংশ রক্ষা করতে পারেনা তাই তারা বংশের প্রদীপ ও হতে পারেনা।

আমার মায়ের অপরাধ সে একটা ছেলে সন্তান জন্মদিতে পারেনি তাই বাবা ছেলে সন্তানের জন্য আর একটা বিয়ে করতে যাচ্ছে।
বাবা প্রথমে বিয়েতে রাজি ছিলনা পরে কি ভেবে রাজি হয়ে গেলো।

আমার চাচা, ফুফুরা মূল চক্রান্তকারী তারাই বাবাকে বিয়ের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের এক কথা পোলা হইলো বংশের প্রদীপ। ভাইজান তুমি মারা গেলে যে কি হইবে। এত বিশাল সম্পত্তি জামাইরা লুইট্টা পুইট্টা খাইবে। তোমার নাম ডাক ধুলায় মিশে যাবে। আলী আহামেদ খন্দকারে নাম ডাক কিছু থাকবে না সব শেষ হয়ে যাবে।

আমরা কি সমাজে বাস করি ছেলে সন্তানেরা সম্পত্তি ভোগ করলে বাবার সম্মান বৃদ্ধি পায় আর কন্যা সন্তানেরা সম্পত্তি ভোগ করলে বাবার সম্মানহানি হয়। কন্যা সন্তানরা কি বাবার ঔরসের সন্তান না।

আমি বাবার সামনে বসে আছি বাবাকে আজ খুব খুশি দেখাচ্ছে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পরে আছে এখন সৌদিআরব থেকে আনা সুগন্ধী আতোর গায়ে মাখছে।
শুনেছি বাবা যাকে বিয়ে করবে সে আমার বড় আপার বয়সি। অনেক গরিব ঘরের মেয়ে বাবার সম্পত্তি টাকা পয়সা দেখে বিয়ে দিচ্ছে।

মা বলেছে এখন থেকে মা আমার সাথে থাকবে তাই মায়ের প্রয়োজনিয় জীনিসপত্র আমার রুমে এনে গুছাচ্ছে। মায়ের চোখ লাল হয়ে আছে মনে হয় অনেক কেঁদেছে। 
ফুফুরা মায়ের রুমটা ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে এখন থেকে নতুন মা ঐ রুমে থাকবে।

মা ও তো একদিন এমন ভাবে বউ সেঁজে এসেছিল বাবার ঘরে হয়তো মায়ের জন্য এভাবে বাসর ঘর সাজিয়েছিল। কিন্তু আজ মায়ের পঁয়ত্রিশ বছরের ভালোবাসার ইতি টানটে যাচ্ছে। মা কি জানতো এই বয়সে এসে তাকে সতিনের সংসার করতে হবে। আর যাই হোক কোন স্ত্রী চায়না তার ভালোবাসার ভাগ অন্যকে দিতে। আর আজ পৃথিবীর সব থেকে কঠিন কাজটি আমার মা করতে যাচ্ছে। তার ভালোবাসার মানুষটাকে, হাজারো কষ্টের মাঝে গড়ে তোলা সংসারটাকে অর্ধেক ভাগ দিতে হবে।
কপালের লিখন না যায় খন্ডন মায়ের ভাগ্যে হয়তো এটাই লেখা ছিল।

আমার চাচা,ফুফুরা চেয়েছিল তাদের গন্ডমূর্খ ছেলেদের সাথে আপুদের বিয়ে দিয়ে সবসম্পত্তি ভোগদখল করে খাবে কিন্তু মায়ের জন্য পারেনি। এই জন্য মায়ের উপর অনেক ক্ষোভ ছিল তাদের তাই তো বাবাকে কানপরামর্শ দিয়ে বিয়েতে রাজি করিয়েছে। আর বাবাও পুত্র সন্তানের আসায় বিয়েতে রাজি হয়ে গেল।বাবার নতুন বউয়ের যদি ছেলে না হয় তাহলে বাবা কি আবারো আর একটা বিয়ে করবে..?

দেখোতো আমি একাই বগ বগ করে যাচ্ছি আমার পরিচয়টা দিতে ভুলে গিয়েছি। আমি শারমিন নিশি ক্লাস এইটে পড়ি চার বোনের মধ্যে সবার ছোট ।
আমার বড় বোনের নাম জান্নাত চার বছর হল বিয়ে হয়েছে একটা ছেলে আছে। মেঝ আপু আইন নিয়ে পড়াশুনা করছে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। ছোট আপু ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। মজার বিষয় হল বাবা যে বিয়ে করছে আপুরা কেউ জানে না কারন আপুরা জানলে এই বিয়ে কখনো হতে দিতো না। কি আজব ব্যাপার যেখানে বাবা মেয়ে বিয়ে দেবার কথা সেখানে বাবা নিজেই বিয়ে করতে যাচ্ছে।
বাবার খুব ইচ্ছা আমি যেন তার বিয়ের বর যাত্রিতে যাই কিন্তু আমি মাকে একা রেখে কোথাও যাবো না।
বিয়ে করে বাবা নতুন মাকে নিয়ে এসেছে। সবার সাথে নতুন মাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

— নিশি এদিকে আসো এটা হল তোমার নতুন মা।এখন থেকে উনাকে ছোট মা বলে ডাকবে।
— আমি মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলাম ঠিক আছে বাবা।
মা আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে আছে।
মা তোমার কি অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমি মাথায় তেল দিয়ে দেই।

— না মা, তুমি ঘুমাও সকালে স্কুলে যেতে হবে।
— বাবা বলেছে কাল স্কুলে যাওয়া লাগবে না।
— পৃথিবী উল্টে গেলেও পড়াশুনা বন্ধ দেওয়া যাবেনা কাল তুমি স্কুলে যাবে। তোমাদের কে অনেক বড় হতে হবে। সবাই গর্ব করে বলবে খন্দকার বাড়ির মেয়ে।
সারারাত মা একটুও ঘুমাইনি ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে। আমি একাই ছিলাম মায়ের কষ্টের সাক্ষী।
চলবে..

 

 

 

 

About regulartechbd

Check Also

কালো বিড়াল!

কালো বিড়াল! কালো বিড়ালকে অনেকেই অশুভ বলে, আবার অনেকে পছন্দ করেন না। প্রায় দেখা যায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *